২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থায়নে এলআইসিটি প্রকল্পে একটি নতুন অঙ্গ যোগ করা হয়েছিল — অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং শিল্পের জন্য আরও ১০ হাজার তরুণ ও নারীকে প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়াল ৪০ হাজার। দুইবার দরপত্র প্রক্রিয়া চালিয়েও কার্যক্রমটি বাতিল করতে হয়, এবং লক্ষ্যমাত্রা নামিয়ে আবার ৩০ হাজারে ফিরিয়ে আনা হয়। ফলাফল দাঁড়াল ৩৩,৯৩০ — লক্ষ্যমাত্রার ১১৩ শতাংশ। খাতায় প্রকল্পটি সফল। বাস্তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য বরাদ্দ প্রশিক্ষণটি কখনো দেওয়াই হয়নি।

এটি কোনো ব্যতিক্রম নয়, এটিই মডেল। সরকার বদলায়, প্রকল্পের নাম বদলায়, বাস্তবায়নকারী দপ্তর বদলায় — বদলায় না শুধু একটি জিনিস: প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা গোনা হয়, কর্মসংস্থান নয়। আর এসবের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আরও বড় প্রশ্ন: যে বাজারটির জন্য এই প্রশিক্ষণ, সেই বাজারটিই এখন সংকুচিত হচ্ছে।

৳১,৪২৫ কোটি ফ্রিল্যান্সিংকে সরাসরি লক্ষ্য করা প্রকল্পে চিহ্নিত ব্যয় ও প্রতিশ্রুতি
৩১.৭% এলআইসিটিতে প্রশিক্ষিতদের যত অংশ সরাসরি চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছেন — প্রকল্পের নিজের ৬০% শর্তের প্রায় অর্ধেক
১.৮৭% ৬৯ কোটি টাকার নারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিতদের যত অংশ আউটসোর্সিং কাজে যুক্ত হয়েছেন
−৩২% ২০২৫ সালে আপওয়ার্কে লেখালেখির কাজের এক বছরের পতন — প্ল্যাটফর্মের সবচেয়ে বড়

হিসাবের গোড়া: ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে আসলে কত টাকা

আলোচনায় প্রায়ই ছয় হাজার কোটি টাকার অঙ্ক শোনা যায়। সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে হলে ড্রাইভিং, মোবাইল সার্ভিসিং, পোশাকশিল্পের কারিগরি প্রশিক্ষণ — সব একসঙ্গে যোগ করতে হয়। কিন্তু দক্ষতা উন্নয়ন আর ফ্রিল্যান্সিং এক জিনিস নয়, এবং দুটিকে মিলিয়ে ফেললে প্রশ্নটিই ঘোলাটে হয়ে যায়। তাই এই হিসাবটি আলাদা করে রাখা হয়েছে।

ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন আউটসোর্সিংকে সরাসরি লক্ষ্য করা প্রকল্প
প্রকল্পবাস্তবায়নকারীমেয়াদব্যয়
লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি)আইসিটি বিভাগ২০১৬–২০২২৳৩২০ কোটি
ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ পাইলট, ১৬ জেলাযুব উন্নয়ন অধিদপ্তর২০২২–২০২৪৳৪৭.৫ কোটি
যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (১ম সংশোধিত)যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর২০২৪–২০২৭৳৩৭৪ কোটি
সিটি করপোরেশনে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ (প্রস্তাবিত)যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর২০২৬–২০৩১৳৬৮৩ কোটি
ফ্রিল্যান্সিং-নির্দিষ্ট চিহ্নিত মোট~৳১,৪২৫ কোটি

সংখ্যাটি ছয় হাজার নয় — কিন্তু একটি একক, সংকীর্ণ উদ্দেশ্যের জন্য এটিও কম নয়, বিশেষত যখন ফলাফলের হিসাব প্রায় অনুপস্থিত। প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে শুধু আইসিটি বিভাগের অধীনেই ১১টি প্রকল্প ও ১৫টি কর্মসূচির মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং, ভাষা, সাইবার ও ডিজিটাল লিটারেসি প্রশিক্ষণের নামে খরচ হয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

এগুলো ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ নয় — শুধু তুলনার জন্য

  • আইসিটি বিভাগের প্রশিক্ষণ প্রকল্প ও কর্মসূচি (২০০৯–২০২৪) — ~৳২,০০০ কোটি
  • এলআইসিটির আইটি/আইটিইএস অঙ্গ (বিসিসি, বিশ্বব্যাংক, ২০১৩–২০১৯) — ৪৪.৫ মি. ডলার
  • আইসিটি বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যয় (২০১০–২০২৪) — ৳২৫,০০০ কোটি
  • মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণে উদ্যোক্তা সৃষ্টি (প্রস্তাবিত) — ৳৫০৬ কোটি

এই অঙ্কগুলো উপরের সারণির সঙ্গে যোগ করা হয়নি — ভিন্ন উদ্দেশ্যের প্রকল্প যোগ করলে সংখ্যাটি কৃত্রিমভাবে বড় হয়, আর ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশ্নটির উত্তর মেলে না।

তুলনার জন্য: ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব হিসাবেই ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত টেলিকম ও আইসিটি খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা — এর মধ্যে আইসিটি খাতেই ২৫ হাজার কোটি।

যেকোনো নতুন প্রকল্প দলিল পড়ার সময় প্রথম কাজটি তাই সহজ: প্রশ্ন করুন প্রকল্পটি ফ্রিল্যান্সিং শেখাচ্ছে, নাকি সাধারণ কম্পিউটার সাক্ষরতা শেখাচ্ছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে। দুটির বাজেট এক হলেও দুটির প্রতিশ্রুতি এক নয়।

এলআইসিটি: গলদটা বিশ্বব্যাংকের নিজের নথিতেই লেখা আছে

সরকারি আইসিটি প্রশিক্ষণের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ভালোভাবে নথিভুক্ত উদাহরণ হলো এলআইসিটি — “লিভারেজিং আইসিটি ফর গ্রোথ, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স”। বাস্তবায়নে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক। অনুমোদন ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে, শেষ ২০১৯ সালের ৩০ জুন। মোট প্রকল্প ব্যয় অনুমোদিত ১০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, প্রকৃত ছাড় ৯১.৮৫ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আইটি/আইটিইএস শিল্প উন্নয়ন অঙ্গে খরচ হয়েছে ৪৪.৫ মিলিয়ন ডলার — অনুমোদিত ৩৫ মিলিয়নের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি।

মূল সংখ্যা

৩৫,০০০ জনকে প্রশিক্ষণ। সরাসরি চাকরি ১১,১০০ জনের।

বিশ্বব্যাংকের সমাপ্তি ও ফলাফল প্রতিবেদনের (ICR) ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদের ভাষ্য অবিকল এই: The project helped train over 35,000 people in IT/ITES skills and directly placed more than 11,100 of its beneficiaries into jobs.

একটি মাপকাঠি আছে, এবং সেটি এই প্রতিবেদনেরই ভেতরে। ৮৯ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা আছে, টপ-আপ প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগ করা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ওপর শর্ত ছিল ন্যূনতম ৬০ শতাংশ কর্মসংস্থান। প্রকল্প নিজেই যে মানদণ্ড ঠিক করেছিল, প্রাপ্ত ফল তার প্রায় অর্ধেক। বাকি প্রায় ২৪ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর কী হলো, প্রতিবেদনে তার কোনো হিসাব নেই।

যে সংখ্যাটি দিয়ে সাফল্য মাপা হয়েছে, সেটি প্রশিক্ষণার্থীদের নয়

প্রকল্পের মূল সাফল্যসূচক ছিল “আইটি/আইটিইএস কর্মসংস্থান”: ভিত্তিবছরে ১২ হাজার, লক্ষ্যমাত্রা ৪২ হাজার, অর্জন ৪৭ হাজার। লক্ষ্যমাত্রার ১১২ শতাংশ। প্রতিবেদনে এটিকে সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কিন্তু এটি পুরো শিল্পের কর্মসংস্থান, প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থীদের নয়। ছয় বছরে দেশের সফটওয়্যার ও আইটিইএস শিল্পে যত মানুষ যোগ দিয়েছেন, তার পুরোটাই এখানে প্রকল্পের ঘরে তোলা হয়েছে — অথচ প্রকল্প নিজেই স্বীকার করছে, তার সরাসরি প্লেসমেন্ট ১১ হাজার ১০০।

এটি কেবল বাইরের সমালোচনা নয়। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব স্বাধীন মূল্যায়ন বিভাগ (আইইজি) এই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে লিখেছে, শিল্পব্যাপী রাজস্ব ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে প্রকল্পের আউটপুটের সম্পর্ক “সীমিত”, এবং প্রকল্পের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যখন সবে গতি পাচ্ছিল তখনই এই বৃদ্ধি ছিল “দৃঢ় ঊর্ধ্বমুখী ধারায়”। আইইজি আরও লিখেছে, সমাপ্তি প্রতিবেদনটি সূচকের মানগুলোর সঙ্গে প্রকল্পের কার্যক্রমের সম্পর্ক “পর্যাপ্তভাবে আলোচনা করেনি”। প্রকল্পের নিজস্ব মূল্যায়ন ছিল Satisfactory; আইইজি সেটি নামিয়ে Moderately Satisfactory করেছে।

আর ফ্রিল্যান্সিং অংশটি? সেটি কখনো হয়ইনি

বিশ্বব্যাংকের নথির ভাষা এখানে অস্বচ্ছ নয়। অতিরিক্ত অর্থায়নের ১২ মিলিয়ন ডলারের একটি অংশ নির্দিষ্ট করা হয়েছিল অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং উপ-শিল্পের জন্য একটি নতুন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে। এরপর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিটকে “দুইবার দরপত্র প্রচেষ্টার পর গুরুতর ক্রয়-ঝুঁকির কারণে” কার্যক্রমটি বাতিল করতে হয়। প্রতিবেদনের অন্যত্র আরও স্পষ্ট: প্রকল্প দলকে স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়ার ওপর বাইরের চাপ সামলাতে হয়েছে।

হরটি বদলে গেল

একজন বাড়তি মানুষকেও প্রশিক্ষণ দিতে হয়নি

কার্যক্রম বাদ পড়ায় লক্ষ্যমাত্রা ৪০ হাজার থেকে নামিয়ে আবার ৩০ হাজারে ফেরানো হয়। অর্জন দাঁড়ায় ৩৩,৯৩০ জন।

  • ৪০,০০০-এর লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে ভাগ করলে — অর্জন ৮৫%, অর্থাৎ ব্যর্থতা
  • ৩০,০০০ দিয়ে ভাগ করলে — অর্জন ১১৩%, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া

খাতায় প্রকল্পটি সফল, আর বাস্তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য বরাদ্দ প্রশিক্ষণটি কখনো দেওয়াই হয়নি।

প্রশিক্ষণ দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ, কিন্তু তাদের টেকসই চাকরি ও আয় নিশ্চিত করা অনেক বেশি কঠিন।— বিশ্বব্যাংকের এলআইসিটি সমাপ্তি ও ফলাফল প্রতিবেদন, ৮৯ নম্বর অনুচ্ছেদ

একই অনুচ্ছেদে আরেকটি বাক্য আছে, যা আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে প্রায় ভবিষ্যদ্বাণীর মতো শোনায়: প্রকল্প বাস্তবায়নকালেই শিল্পটি ভুগেছে “উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়া অটোমেশনের” কারণে, যা বাংলাদেশের কিছু আইটিইএস সেবার চাহিদা কমিয়ে দিয়েছিল। ২০১৯ সালেই বিশ্বব্যাংক এটি লিখে গিয়েছিল। তার পরের সাত বছরে বাংলাদেশ আরও অন্তত চারটি বড় ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ প্রকল্প নিয়েছে।

নতুন প্রকল্প মূল্যায়নের সবচেয়ে সস্তা উপায়টি তাই এই: দলিলটিতে এলআইসিটির সমাপ্তি প্রতিবেদনের উল্লেখ আছে কি না দেখুন। না থাকলে ধরে নিতে হবে, আগের ৭৭০ কোটি টাকার অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শেখা হয়নি।

প্রশিক্ষিত কতজন, কাজ পেলেন কতজন

ফ্রিল্যান্সিং-লক্ষ্যী প্রকল্পে প্রশিক্ষণার্থী বনাম নথিভুক্ত ফলাফল

প্রতিটি দণ্ডের পুরো দৈর্ঘ্য = মোট প্রশিক্ষণার্থী; রঙিন অংশ = নথিভুক্ত ফলাফল। দণ্ডগুলো পাশাপাশি পড়া যাবে না — প্রতিটির সংজ্ঞা ও যাচাইয়ের মান আলাদা।

কর্মসংস্থান / আয় করছেন যাঁদের হিসাব নেই
এলইডিপি — আইসিটি বিভাগ (অযাচাইকৃত দাবি)৩২,২৩৪ / ৭৭,০০০ · ৪১.৮%
এলআইসিটি — বিসিসি / বিশ্বব্যাংক (নিরীক্ষিত)১১,১০০ / ৩৫,০০০ · ৩১.৭%
জেলাভিত্তিক নারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ — আউটসোর্সিংয়ে১.৮৭%

সংজ্ঞা ভিন্ন: এলআইসিটি “সরাসরি চাকরিতে নিয়োগ”, এলইডিপি “ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয়” (প্রকল্পের নিজস্ব অযাচাইকৃত দাবি), নারী প্রশিক্ষণ “আউটসোর্সিং কাজে যুক্ত”। এ কারণে দণ্ডগুলো যোগ করা বা সরাসরি তুলনা করা যায় না। জেলাভিত্তিক নারী প্রশিক্ষণে মোট প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, তাই শুধু হার দেখানো হলো।

প্রতিটির “ফলাফল” আলাদা সংজ্ঞায় মাপা
প্রকল্পব্যয়প্রশিক্ষিতফলাফলসংজ্ঞা ও যাচাই
এলইডিপি (আইসিটি বিভাগ)৳৩২০ কোটি৭৭,০০০৩২,২৩৪“ফ্রিল্যান্সিংয়ে আয় করছেন” — প্রকল্পের নিজস্ব দাবি, অযাচাইকৃত
এলআইসিটি (বিসিসি, বিশ্বব্যাংক)৯১.৮৫ মি. ডলার৩৫,০০০+১১,১০০+“সরাসরি চাকরিতে নিয়োগ” — নিরীক্ষিত সমাপ্তি প্রতিবেদন
ফ্রিল্যান্সিং পাইলট, ১৬ জেলা৳৪৭.৫ কোটি~১,৯০০৬৪%মধ্যবর্তী মূল্যায়ন, প্রকল্পের নিজস্ব
জেলাভিত্তিক নারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ (২০১৩)৳৬৯ কোটিপ্রকাশ করা হয়নি১.৮৭%“আউটসোর্সিং কাজে যুক্ত” — স্বাধীন অনুসন্ধান
সারিগুলো যোগ করা যায় না — সংজ্ঞা ও যাচাইয়ের মান আলাদা।

একটি বিষয় লক্ষণীয়: শতাংশ যত বেশি, যাচাই তত কম। ৩১.৭ শতাংশের সংখ্যাটি এসেছে বিশ্বব্যাংকের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন থেকে। ৬৪ শতাংশের দাবিটি এসেছে প্রায় ১,৯০০ জনের ওপর চালানো প্রকল্পের নিজস্ব মধ্যবর্তী মূল্যায়ন থেকে। এলইডিপির ৪১.৮ শতাংশের ভিত্তি আরও দুর্বল: ৩২,২৩৪ সংখ্যাটির উৎস একটি সংবাদ প্রতিবেদন, যা “এলইডিপির নথি” উদ্ধৃত করেছে; প্রকল্পের ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট নথিটি আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটে আর পাওয়া যায় না। একই বাক্যে ওই প্রতিবেদন দাবি করেছে, এই ৩২ হাজার মানুষের মোট আয় প্রায় ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার — অর্থাৎ মাথাপিছু দেড় লাখ ডলারের বেশি, যা অসম্ভব। যে সূত্র একই বাক্যে এমন দাবি করে, তার দেওয়া কর্মসংস্থানের সংখ্যাটিও সমান সতর্কতায় পড়া দরকার।

আইএমইডির মাঠপর্যায়ের হিসাব

তিন বছর পর মাঠে গিয়ে দেখা গেল প্রশিক্ষণার্থীরা কোথায়

“প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন” প্রকল্প — লালমনিরহাট, জামালপুর, ভোলা ও পটুয়াখালীতে ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৩৮ কোটি টাকায় ৫,১৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ।

  • ড্রাইভিংয়ে প্রশিক্ষিত ২,৫৪৫ জনের মধ্যে সেই পেশায় নিয়োজিত ৭২ জন (২.৮২%)
  • কম্পিউটার ও আইটিতে প্রশিক্ষিত ২,৬৪০ জনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কাজে ১২১ জন (৪.৫৮%)
  • অতিদরিদ্রদের জন্য নেওয়া প্রকল্পের অংশগ্রহণকারীদের ৪৬ শতাংশেরই স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল

আইএমইডির সিদ্ধান্ত — প্রকল্পের কাঠামো ও বাস্তবায়ন “ত্রুটিপূর্ণ”, কর্মসংস্থানের ফলাফল “প্রত্যাশার তুলনায় বহুগুণ কম”। এটি ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প নয়, তাই উপরের হিসাবের বাইরে — কিন্তু ইঙ্গিত দেয় সমস্যাটি কোনো একটি খাতের নয়, প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সাধারণ নকশার।

তাই যেকোনো সাফল্যের হার শোনার সঙ্গে সঙ্গে একটিই প্রশ্ন করুন: কে মেপেছে, কখন মেপেছে, আর “কর্মসংস্থান” বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে।

“নামকাওয়াস্তে প্রশিক্ষণ” এবং ফাঁপা ডেটাবেজ

সংখ্যার পেছনে কারণটি নথিভুক্ত, এবং সেটি নতুন নয়। ২০২০ সালেই আইএমইডি এলইডিপি নিয়ে নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলেছিল — ফ্রিল্যান্সার তৈরির জন্য এই প্রশিক্ষণের মেয়াদ যথেষ্ট নয় এবং দক্ষ প্রশিক্ষক দরকার। ছয় বছর পরেও নতুন প্রকল্পগুলোর কাঠামো প্রায় অভিন্ন: তিন মাস, ৩০০–৬০০ ঘণ্টা, গ্রাফিক ডিজাইন–ডিজিটাল মার্কেটিং–ওয়েব ডিজাইনের একই ত্রয়ী, দৈনিক ভাতা, একটি সনদ, এবং তারপর নীরবতা।

একজন প্রশিক্ষিত মানুষ উদ্যোক্তা হতে চাইতে পারেন, কিন্তু অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশ বা নেটওয়ার্কিং সহায়তা ছাড়া প্রশিক্ষণটি একটি সনদপত্রের বেশি কিছু নয়।— মোস্তফা কে মুজেরী, নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট

সরকারি কর্মকর্তারা নিজেরাই স্বীকার করেন, প্রকল্পের মেয়াদ সাধারণত দুই থেকে তিন বছর — এরপর পরিবীক্ষণ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে প্রকল্প শেষে যে সাফল্যের সংখ্যা প্রকাশিত হয়, তা মূলত প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার দিনের সংখ্যা।

‘ভুতুড়ে’ সুবিধাভোগী ও যেখানে অর্থটা আসলে যায়

জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলাভিত্তিক নারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রকল্পে সরকারি ডেটাবেজে যাঁদের “উদ্যোক্তা” হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, তাঁদের অনেকেই বাস্তবে বেকার। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২১টি প্রকল্পে ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরও নগ্ন চিত্র — সুবিধাভোগী বাছাইয়ে ব্যাপক অনিয়ম, বিধবাদের তালিকায় পুরুষের নাম।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পর্যালোচনা কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, চলমান ২১টি আইসিটি প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয় অঙ্গ বাদ দিলেই প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব ছিল। কমিটির পর্যবেক্ষণ আরও একটি কাঠামোগত সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে: আইসিটি বিভাগের সবগুলো শাখা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ডিজিটাল ল্যাব তৈরির মতো একই ধরনের প্রকল্পে কাজ করেছে, যেন বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, আইসিটি ডিপার্টমেন্ট ও হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের আলাদা কোনো কাজ নেই।

প্রশিক্ষণের মান যাচাইয়ের একটি সরল পরীক্ষা আছে: প্রকল্প দলিলে প্রশিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রশিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত লেখা আছে কি না দেখুন। না থাকলে মেয়াদ যত দীর্ঘই হোক, ফলাফল আগেই অনুমেয়।

যে বাজারের জন্য প্রশিক্ষণ, সেটিই সংকুচিত হচ্ছে

এতক্ষণের আলোচনা ছিল বাস্তবায়নের ব্যর্থতা নিয়ে। কিন্তু ধরা যাক, প্রশিক্ষণ নিখুঁত হলো — প্রশিক্ষক দক্ষ, মেয়াদ পর্যাপ্ত, পরিবীক্ষণ দীর্ঘমেয়াদি। তারপরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: কাজগুলো আছে তো?

বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্মে সংকোচন

বার্ষিক পরিবর্তন, ২০২৫ (নেতিবাচক)

আপওয়ার্কে লেখালেখির কাজ−৩২%
অনুবাদের কাজ (৫০ লাখ পোস্টিং বিশ্লেষণ)−১৯%
ফাইভারের বার্ষিক সক্রিয় ক্রেতা৩১ লাখ · −১৩.৬%
আপওয়ার্কের সক্রিয় ক্লায়েন্ট৮.৩২ → ৭.৮৫ লাখ · −৫.৭%

সূত্র: আপওয়ার্ক ও ফাইভারের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন; ৫০ লাখ জব পোস্টিংয়ের স্বাধীন বিশ্লেষণ। দণ্ডের দৈর্ঘ্য পতনের আপেক্ষিক মাত্রা বোঝাতে, সর্বোচ্চ পতনকে ১০০ ধরে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কপি-এডিটিং ও প্রুফরিডিংয়ের মতো লেখানির্ভর সেবায় নতুন চুক্তি মাসে প্রায় ২ শতাংশ হারে কমছে এবং প্ল্যাটফর্মে মোট মাসিক আয় কমছে প্রায় ৫ শতাংশ হারে।

সবচেয়ে বড় অমিল

যে কাজগুলো এআই সবার আগে খেয়ে ফেলছে, ঠিক সেগুলোই আমরা শেখাচ্ছি

বৈশ্বিক বিশ্লেষণে যে ক্যাটাগরিগুলোতে ধস সবচেয়ে দ্রুত: লোগো ডিজাইন, ব্লগ রাইটিং, সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট, বেসিক কপিরাইটিং এবং সাধারণ ডেটা এন্ট্রি — অর্থাৎ যেসব কাজ এআই এখন প্রায় শূন্য প্রান্তিক খরচে করে দিচ্ছে।

আর সরকারি প্রকল্পের সিলেবাসে কী আছে? যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ৩৭৪ কোটি টাকার প্রকল্পে — কম্পিউটারের প্রাথমিক শিক্ষা, গ্রাফিক ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিং। প্রস্তাবিত ৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্পে — গ্রাফিক ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও ডেটা প্রসেসিং। দুটি তালিকা প্রায় হুবহু মিলে যায়।

বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে

অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অনলাইন শ্রম সরবরাহকারী — বৈশ্বিক শ্রমের ১৬ শতাংশ, ভারতের ২৪ শতাংশের পরেই। কিন্তু বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের ঘণ্টাপ্রতি হার ১০ ডলারের নিচে, ভারত-পাকিস্তান-ফিলিপাইনের চেয়েও কম; পেওনিয়ারের তথ্য অনুযায়ী গড় মাসিক আয় ৫০০–৭০০ ডলার। অর্থাৎ সংখ্যায় দ্বিতীয়, মূল্যে পিছিয়ে — এবং এটি প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়িয়ে সমাধানযোগ্য নয়। বরং সংখ্যা বাড়ালে নিচের দিকের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয় এবং হার আরও কমে।

জাতিসংঘের আইটিইউ প্রকাশিত ২০২৪ সালের আইসিটি ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-তে ৬২ — মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভিয়েতনাম ও ভুটানের পেছনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আইসিটি সেবা রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৭২.৫ কোটি ডলার — আগের বছরের চেয়ে ৭.৭ শতাংশ বেশি হলেও ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বহু দূরে।

এই সংখ্যাগুলো একসঙ্গে যা বলে: বাংলাদেশ বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্স শ্রমবাজারের নিচের ধাপে বিপুল সংখ্যায় প্রবেশ করেছে, আর ঠিক সেই নিচের ধাপটিই এআই সবার আগে মুছে দিচ্ছে। যেকোনো নতুন সিলেবাস অনুমোদনের আগে তাই একটিমাত্র পরীক্ষা যথেষ্ট: প্রস্তাবিত ক্যাটাগরিটির বৈশ্বিক পোস্টিং গত ১২ মাসে বেড়েছে না কমেছে, সেটি দেখে নিন।

তবু নতুন প্রকল্প, তবু একই নকশা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশটি এখানেই। পূর্ববর্তী প্রকল্পগুলোর ফলাফল সামনে থাকা সত্ত্বেও নতুন প্রকল্পের সারি প্রায় একই বৈশিষ্ট্য নিয়ে এগোচ্ছে — দুর্বল পরিকল্পনা, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ, এবং কর্মসংস্থানের বদলে প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যাকেই সাফল্যের একক ধরা।

চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প
প্রকল্পব্যয়প্রশিক্ষণার্থীমেয়াদ
যুবদের ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (১ম সংশোধিত)৳৩৭৪ কোটি৩৬,০০০২০২৪–২০২৭
আইসিটি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের এআই দক্ষতা উন্নয়ন৳৪৬ কোটি৯,৬০০ + ১,৬০০২০২৫–২০২৭
মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণে উদ্যোক্তা সৃষ্টি (প্রস্তাবিত)৳৫০৬ কোটি৩৮,৪০০প্রস্তাবিত
সিটি করপোরেশনে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ (প্রস্তাবিত)৳৬৮৩ কোটি৫১,০০০+২০২৬–২০৩১

প্রস্তাবিত ৬৮৩ কোটি টাকার প্রকল্পটির দলিলে দাবি করা হয়েছে, প্রশিক্ষণ শেষে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী আয়মূলক কাজে যুক্ত হতে পারবেন এবং তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই আয় শুরু করবেন। তুলনার জন্য সবচেয়ে ভালোভাবে নিরীক্ষিত পূর্ব-অভিজ্ঞতাটি হলো এলআইসিটি — সেখানে সরাসরি কর্মসংস্থানের হার ছিল ৩১.৭ শতাংশ, এই প্রক্ষেপণের অর্ধেকেরও কম। প্রকল্প দলিলে এই পূর্ব-অভিজ্ঞতার কোনো উল্লেখ নেই।

অনুমোদনের ফাঁক

৪৬ কোটি টাকার এআই প্রকল্পটির আকারও লক্ষণীয়

৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না — সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাই অনুমোদন দিতে পারেন। বিগত সরকারের আমলে ঠিক এই আকারের ছোট প্রকল্প নিয়েই অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উঠেছিল।

চার দিকের এআইয়ের হাইপে আমরাও মনে হয় গা ভাসাচ্ছি। এআই প্রশিক্ষণ আর এআই টুল ব্যবহারের প্রশিক্ষণের মধ্যে তফাত আছে। অল্প কিছু পাইলট চালিয়ে উদ্দেশ্য অর্জিত হলে তারপর দেশব্যাপী বড় কার্যক্রম হাতে নেওয়া উচিত।— অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন, পরিচালক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
একাধিক সংস্থা ও মন্ত্রণালয় একই ধরনের প্রশিক্ষণ দিলে অপচয়ের সুযোগ থাকে। অতীতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা ভালো নয়। বোঝা যায়, প্রকল্পগুলো আগের মতো আমলাতান্ত্রিক মডেলেই বাস্তবায়িত হবে।— জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

সাতটি গলদ, যা প্রতিবার ফিরে আসে

ব্যক্তিগত অনিয়ম বা একক প্রকল্পের ব্যর্থতা নয় — সমস্যাটি নকশার। প্রণোদনা কাঠামো যেভাবে সাজানো, তাতে এই সাতটি গলদ প্রতিবার ফিরে আসতে বাধ্য:

  1. ইনপুট মাপা হয়, আউটকাম নয়। সাফল্য নির্ধারিত হয় কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো তা দিয়ে। কতজন কাজ পেলেন — সেটি কোনো বাধ্যতামূলক সূচক নয়।
  2. প্রকল্প শেষ, পরিবীক্ষণ শেষ। দুই-তিন বছরের মেয়াদ ফুরালে প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়। কর্মসংস্থানের প্রকৃত হার তাই সরকারের কাছে কখনো থাকে না।
  3. প্লেসমেন্টের কোনো চুক্তিবদ্ধ দায় নেই। প্রশিক্ষণ ফার্মের অর্থপ্রাপ্তি প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত, চাকরি বা আয়ের সঙ্গে নয়। ফলে ব্যাচ পূরণ করাই একমাত্র বাণিজ্যিক প্রণোদনা।
  4. সিলেবাস বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংক অটোমেশনের ঝুঁকি লিখে যাওয়ার পরেও ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত প্রকল্পে সেই একই ক্যাটাগরি রয়ে গেছে।
  5. একই কাজ বহু দপ্তরে। আইসিটি বিভাগ, বিসিসি, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহিলা সংস্থা, সমাজসেবা অধিদপ্তর — সবাই সমান্তরালে প্রায় অভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়, আলাদা বাজেটে, কোনো সমন্বয় ছাড়াই।
  6. সুবিধাভোগী বাছাই অস্বচ্ছ। অতিদরিদ্রদের প্রকল্পে ৪৬ শতাংশ স্নাতক-স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী — সরকারি মূল্যায়নেই নথিভুক্ত।
  7. প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কোনো সেতু নেই। অর্থায়ন, ইন্টার্নশিপ, ক্লায়েন্ট সংযোগ, পেমেন্ট গেটওয়ে, মেন্টরশিপ — সনদ থেকে প্রথম আয় পর্যন্ত পৌঁছানোর কোনো কাঠামো নেই।

যাদের নিয়ে এই হিসাব

২.৬৮ কোটি ১৫–২৯ বছর বয়সী শ্রমশক্তির আকার
১৯.৪ লাখ এর মধ্যে বেকার তরুণ
৩১.৫% বেকার তরুণদের যত অংশের উচ্চশিক্ষা রয়েছে
৬১.৭% মোট NEET তরুণের যত অংশ নারী

শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ — কোনোটিতেই নেই (NEET) এমন তরুণের হার ১৮.৯ শতাংশ। এই সংখ্যাগুলোই প্রতিটি প্রকল্প দলিলের ন্যায্যতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, এবং হওয়া উচিতও। প্রশ্নটি প্রয়োজন নিয়ে নয় — প্রশ্নটি হলো, বরাদ্দ করা হাজার হাজার কোটি টাকা এই তরুণদের কাছে আসলে কী আকারে পৌঁছাচ্ছে। একটি তিন মাসের সনদ, দৈনিক ভাতা, এবং তারপর একটি সংকুচিত হতে থাকা বৈশ্বিক বাজারে একা ছেড়ে দেওয়া — এটিই যদি মডেল হয়, তবে ব্যয়ের অঙ্ক বাড়িয়ে ফল বদলানো যাবে না।

শুধু প্রশিক্ষণে অর্থ ব্যয় করে ধরে নেওয়া যে আমরা দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছি — এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ, ব্যবহারিক প্রয়োগযোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণ-পরবর্তী সহায়তা ছাড়া এটি জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।— মোস্তফা কে মুজেরী, নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট

যে পরিবর্তনগুলো নথিতেই সুপারিশ করা আছে

  • ইনপুট থেকে আউটকামে — প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যার বদলে যাচাইযোগ্য কর্মসংস্থান ও আয়কে প্রধান সূচক করা; প্রশিক্ষণ ফার্মের অর্থপ্রাপ্তির একটি অংশ প্লেসমেন্টের সঙ্গে শর্তযুক্ত করা।
  • প্রশিক্ষণ → ইন্টার্নশিপ → চাকরি সংযোগ কাঠামো — সনদ থেকে প্রথম আয় পর্যন্ত একটি সেতু।
  • প্রকল্প শেষের পরেও অন্তত তিন বছরের ট্র্যাকিং, স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে; ডেটা প্রকাশ্য রাখা।
  • বড় বরাদ্দের আগে পাইলট — বিশেষত এআইয়ের মতো দ্রুত বদলাতে থাকা খাতে।
  • নিম্ন-মূল্যের ক্যাটাগরি থেকে সরে আসা — লোগো, ব্লগ ও ডেটা এন্ট্রির বদলে সেসব দক্ষতা, যেখানে এআই এখনো প্রতিস্থাপক নয় বরং সহায়ক।
  • একটি একক জাতীয় সমন্বয়, যাতে ছয়টি দপ্তর একই প্রশিক্ষণ ছয়বার না কেনে।

২০২০ সালে আইএমইডি লিখেছিল, প্রশিক্ষণের মেয়াদ যথেষ্ট নয় এবং দক্ষ প্রশিক্ষক দরকার। ২০২৫ সালের জুনে আইএমইডি আবার লিখেছে, প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলো ভুগছে দুর্বল পরিকল্পনা, ভুল লক্ষ্য নির্ধারণ ও ফলোআপের অভাবে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুটি প্রতিবেদন, প্রায় অভিন্ন সিদ্ধান্ত। মাঝখানে খরচ হয়েছে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা।

তথ্যসূত্র

এলইডিপির ব্যয় নিয়ে সূত্রভেদে অসঙ্গতি রয়েছে; এখানে প্রথম আলো ও আইএমইডি-সংশ্লিষ্ট ৩২০ কোটি টাকার অঙ্কটি ব্যবহার করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক নারী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রকল্পে মোট প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা প্রকাশিত না থাকায় তা যোগফলের বাইরে রাখা হয়েছে।